একজন শিক্ষক একজন কারিগর। মানুষ ও সভ্যতার কারিগর। শিক্ষক পৃথিবীর সর্বজন সম্মানীত ব্যক্তি। হাজার দিন গভীর অধ্যয়নের চেয়ে একদিন শিক্ষকের সাহচার্য উত্তম—জাপানি এই প্রবাদ বিশ্লেষণ করলে আমরা শিক্ষকদের মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। এ কারণেই গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, "যারা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তারা অভিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মানীয়।"
পিতা-মাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই। শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী লুনাচারস্কি বলেছিলেন, শিক্ষক হলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি নতুন প্রজন্মের কাছে যুগ-যুগান্তরে সঞ্চিত যাবতীয় মূল্যবান সাফল্য হস্তান্তরিত করবেন, কিন্তু কুসংস্কার, দোষ ও অশুভকে ওদের হাতে তুলে দেবেন না। এটাই হলো শিক্ষকদের গুরুত্বের মাপকাঠি। মনে রাখা প্রয়োজন, শুধু তাদের দিয়েই আমরা সুস্থ কুঁড়িগুলোকে লালন করতে পারি। আলোর পথে এগিয়ে দিতে পারি।
আমেরিকার ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস শিক্ষকের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন- "একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলেন, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।" দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এ বিষয়ে বলেছেন, "শিক্ষক সমাজ হচ্ছেন প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। তাই তো শিক্ষকদের বলা হয় ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ তথা সমাজ নির্মাণের স্থপতি।" সমাজের সার্বিক অগ্রগমনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা সুষ্ঠু সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন এক মৌল উপাদান যেটি যে সমাজে যত বেশি প্রবেশ করেছে সেই সমাজে তত বেশি উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধিত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষক হচ্ছেন পথ-নির্দেশক। কিন্তু সেই শিক্ষক সমাজ নানা কারণে দেশে দেশে যথাযথভাবে তাদের মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে যা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয়।
এ জন্য ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অবস্থান ও মর্যাদা সংক্রান্ত এক দীর্ঘ সুপারিশমালা পেশ করে যা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একে এমন একটি জনসেবামূলক পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে যার পেছনে আছে বিশেষজ্ঞসুলভ জ্ঞান ও বিদ্যা এবং বিশিষ্ট দক্ষতা, যে জ্ঞান ও দক্ষতা দীর্ঘ শ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন অভিনিবেশের ফলেই আয়ত্ত সম্ভব। এই সুপারিশমালায় শিক্ষকদের বেতন ও সুবিধাদি, চাকরিবিধি, কর্মঘণ্টা ও ছুটি, শিক্ষক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষানীতি নির্ণয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলাবিধি প্রয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও অধিকারসহ শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্বে প্রথমবারের মতো এই সুপারিশমালাতে শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই সব দেশের শিক্ষকের জন্য এই সুপারিশমালা একটি মৌলিক সনদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো সুপারিশমালা গৃহীত হওয়ার এ দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে বিশ্বের সর্বত্র উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যার ফলশ্রুতিতে এর পরের বছর থেকেই বিশ্বব্যাপী এ দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত শতাধিক দেশ প্রতি বছর এ দিবসটি পালন করে থাকে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দিবসটি যথাযথভাবে পালনের জন্য অ্যাডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল এবং এর চারশ একটি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে।
দিবসটি পালনের মাধ্যমে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগণকে সচেতন করার প্রয়াস চালানো হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ দেশে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ১০ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মরত থাকলেও এখানে যথাযথ মর্যাদায় সর্বান্তকরণে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয় না; অথচ শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি এক প্লাটফর্ম।
শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়, এটি একটি মহান পেশা। সমাজ গঠনে, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে, সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য। মেধা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান-দক্ষতায় পরিপূর্ণ শিক্ষক হচ্ছেন দেশ ও জাতির অমূল্য মানবসম্পদ। জাতির বুনিয়াদ গঠনে ও জাতীয় ঐতিহ্য-লালনে শিক্ষকের ভূমিকা যে কোনো পেশাজীবীর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য তাদের দেশের শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সঙ্গত কারণে তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। এ জন্য শিক্ষককে নিজ পেশার প্রতি নিবেদিত প্রাণ হতে হয়। একজন শিক্ষক সব সময়ের জন্যই শিক্ষক। তার কর্মক্ষেত্র কেবল শ্রেণিকক্ষেই ব্যাপ্ত নয়; সর্বত্র। একজন ছাত্র শিক্ষককে দেখে শিখবে, তার বক্তব্য শুনে শিখবে, তার আচার-আচরণ লক্ষ্য করে শিখবে। তাই শিক্ষকদের ন্যায়-নীতিবান মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন আদর্শ মানুষ হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। একজন শিক্ষককে তার পেশার উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিনিয়ত নব নব জ্ঞান ও কৌশলের সন্ধানে নিরলস প্রচেষ্টায় নিজেকে নিরত রাখতে হয় এবং পেশাগত মূল্যবোধ, আত্মপ্রত্যয় ও বোধগম্যতার সমন্বয় ঘটিয়ে শ্রেণি-পাঠদান সার্থক করতে হয়।
এটা তখনই সম্ভব হয় যখন শিক্ষক নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বশীল হন। ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন বলেছেন, সমাজ পরিবর্তনের পূর্বশর্ত মানুষের পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের অভিভাবকত্ব শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব। এখন প্রশ্ন হলো আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজ সেই পেশাগত দায়িত্ব কতটুকু পালন করেন? পেশার প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধা পোষণ করেন কিংবা দায়িত্বশীল? পাশাপাশি এই প্রশ্নও চলে আসে, শিক্ষকদের নিজ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্ববান হতে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিবেশ কতটুকু সহায়ক? শিক্ষকগণ তাদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা পান কতটুকু? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যেই এ দেশের শিক্ষার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজ ন্যায্য সুযোগসুবিধা তেমন পায়না। তাদেরও আজকাল দাবী আদায়ের জন্য রাজপথে অান্দোলন করতে হয়। চাকরীর সামান্য আয় দিয়ে কোন রকম সংসার চলে মানুষ গড়ার কারিগরের। এদের সম্মান আকাশ চুম্বি। কাজী কাদের নেওয়াজের শিক্ষাগুরুর মার্যাদাই ইঙ্গিত প্রদান করে শিক্ষকের সম্মান কত উঁচুতে। আজকাল আবার আদর্শ শিক্ষকের বড়ই অভাব। শিক্ষক এখন একটা কর্মাশিয়াল বিষয় অনেকের কাছে। তারপরও আদর্শ শিক্ষকের বিকল্প নাই।
-রানা
শিক্ষক- কনফিডেন্স এইড
ইমেইলঃ confidenceaid2019@gmail.com

No comments:
Post a Comment